Posts

#১০ উপসংহার।

Image
বোলান লোকনাট্যে অংশগ্রহণকারীরা সকলেই গ্রামীণ লোকশিল্পী। তারা কেউই পেশাদার নন। এটি সম্পূর্ণভাবে অবাণিজ্যিক একটি লোক অনুষ্ঠান। এটি গ্রাম্য জনগণকে শুধু বিনোদনই দেয় না, দেয় শিক্ষা, সঞ্চার করে চেতনা। কিন্তু কালের বিচারে আজ বোলানের ভবিষ্যৎ এক প্রশ্নের মুখে। তারাশঙ্করের ‘গণদেবতা’ বা বাংলা চলচ্চিত্র “বাকিটা ব্যাক্তিগত” তে বোলানের প্রসঙ্গ আছে। কিন্তু তা বাদ দিয়ে বোলান এর অনুসঙ্গ আর কোথায়? আর পাঁচটি লোকশিল্পের মত বোলানও মানুষের মন থেকে মুছতে বসেছে। সভ্যতা আজ শহর কেন্দ্রিক। বিশ্বায়নের এই যুগে শহরকেন্দ্রিক সংস্কৃতিগুলিই বৃহত্তর ক্ষেত্রে প্রকাশ পাচ্ছে। অবলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে আঞ্চলিক গ্রাম্য লোকসংস্কৃতি। সরকারের তরফে কিছু কিছু লোকশিল্পকে বাঁচানর চেষ্টা করা হলেও বোলান এর ভাগ্যে সে সাহায্য জোটে নি। বাংলার কটা মানুষ আজ বোলান নামটির সাথে পরিচিত? বোলান সম্পর্কে খুব কম তথ্যই আজ সাধারণ জনগণের জানার সুযোগ রয়েছে। তাই আঞ্চলিক সংস্কৃতির গবেষক স্বপন ঠাকুর বলেছেন, “আগে যে ভাবে বোলান গান হত, এখন তাতে ভাটা পড়েছে। আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার এই রীতি। আধুনিকতা হয়ত অদূর ভবিষ্যতে মুছে দেবে বোলানকে”। মানবমৈত...

#৯ বোলান বন্দনা।

নদীয়া জেলার কৃষ্ণপুর গ্রামের বুদ্ধীশ্বর ঘোষের সৌজন্যে ৭৫ বছরের পুরনো বোলান গানের খাতা থেকে প্রাপ্ত  একটি গানের কিছু অংশঃ- বন্দনা এসো গো মা সরস্বতী কি বলিতে জানি প্রথমে বন্দিবো আমি মায়ের চরণ দুখানি। এসো গো মা সরস্বতী স্কন্ধে দে মা পা গলায় দে মা সুরের ধ্বনি কণ্ঠে সুরসাধা। এসো গো মা সরস্বতী বসো গো মা রথে বুলান বোলিতে হবে বালকের সাথে। যে বুলান বোলিবা মা গো তাই বোলিবো আমি দশের মাঝে ভাঙলে বুলান লজ্জা পাবে তুমি। বন্দনা করিতে হবে আমার হবে অনেকক্ষণ একেবারে বন্দে গাবো যত দেবতাগণ। এ বন্দনা করিতে আমার যে দেবতা এড়ায় লক্ষ লক্ষ প্রণাম হই সেই দেবতা পায়। শুনো শুনো সভাজন করি নিবেদন প্রথমে বন্দিবো হরগৌরীর চরণ। নবদ্বীপে বন্দে গাবো নদের বুড়োশিব চারদিকে বেড়া গঙ্গা মধ্যে নবদ্বীপ। নবদ্বীপে বন্দে গাবো বেড়া নবদ্বীপ খড়ে গঙ্গা যুক্তি করে ভাঙ্গলো নবদ্বীপ। গিরিমাখা বস্ত্রখানি খড়ি উড়ে যায় এখান থেকে প্রণাম হই সেই দেবতার পায়। নবদ্বীপে বন্দে গাবো চৈতন্য গোঁসাই হরি বলে বাহু তুলে নাচে দুটি ভাই। উত্তরে বাহিনী গঙ্গা দক্ষিণেতে রসি যাহা গঙ্গা গয়া কাশী গোলোক বারাণসী।...

#৮ বোলানের প্রকারভেদ ও স্বাধীনতা সংগ্রাম।

বোলানের প্রকারভেদঃ           সাধারণত বাংলায় তিন রকমের বোলানের উল্লেখ পাওয়া যায়। এর মধ্যে একটি হল শ্মশান বোলান। শিব শ্মশানবাসী। এই বোলানের মাধ্যমে তার শ্মশান জীবনকে তুলে ধরা হয়। রাক্ষস বা কঙ্কালের বেশে এই নাচ করা হয়। কেউ শিব সাজতেন। তলোয়ার, মরার খুলি নিয়ে উদ্দাম নৃত্য পরিবেশন করা হয়। তবে অনেক রীতি মেনে বোলান পালন করতে হয়। তাই বর্তমানে শ্মশান বোলানের দলের সংখ্যা কমেছে। আরেক ধরনের বোলান হল ছল বোলান। এই বোলান অত্যন্ত প্রাচীন। সাধারণত শিশুরা এই বোলানে অংশগ্রহণ করত। তবে বর্তমানে এই ছল বোলান বিশেষ ভাবে আর দেখা যায় না। যাত্রা বোলান বা ডাক বোলান বর্তমানে বহুল প্রচলিত। ছোট ছোট পালা গান লিখে যাত্রার আকারে এই বোলান গান গাওয়া হয়। গানের মধ্যে দিয়ে অভিনয় করে দেখানো হয় শিবের নানা আখ্যান। সাধারণত কোন বাংলা বা হিন্দি গানের সুর নকল করে এই গান গাওয়া হয়। তবে এই বোলান গান ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। আঞ্চলিক সংস্কৃতির গবেষক স্বপন ঠাকুর বলেছেন, “আগে যে ভাবে বোলান গান হত, এখন তাতে ভাটা পড়েছে। আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার এই রীতি। আধুনিকতা হয়ত অদূর ভবি...

#৭ বোলান কেন লোকনাট্য?

বোলান গানের ভিডিও দেখুন বোলানে আছে নাটকের আভাস। নাটকে ভিন্ন চরিত্রের জন্য ভিন্ন কুশীলব থাকে। কথা বার্তা, শরীর সঞ্চালনা, অঙ্গভঙ্গি অর্থাৎ action and gesture এর মাধ্যমে শিল্পীরা দৃশ্য ফুটিয়ে তোলেন। বোলানে এইসব থাকে না। যেমন, কোন পালায় মূল গায়েন গাইলেনঃ ‘তখন রাম বলে, ভাইরে লক্ষ্মণ- চলেছে কুথাই?’ সঙ্গে সঙ্গে সহগায়কেরা অই পদটিরই পুনরাবৃত্তি করেন। মূল গায়কের কোন লাইন গাওয়ার পরই সহগাইয়েরা সেই লাইনটি আবার গান। পালার সূচনায় আছে- “বন্দ মাতা দুঃখেরি কন্যা/ আদ্যাশক্তি ভগবতী বেদে আছে জানা/ ভগবতী বলে – দুঃখের কথায় কাজ না ‘বন্দি ভগবতী’- বোলান শুরু করি তাই”। বোলান লোকনাট্যে এককের কথা থাকে না। সকলে মিলে গান গায়। সনাতনী বোলানের রীতি বৈশিষ্ট্য এখানেই। গানের সাথে থাকে নৃত্য। কিন্তু এই নৃত্য পালার চরিত্র বা বিষয় অনুযায়ী হয় না। সুধীর চক্রবর্তী বলেছেন, “একে লোকনাট্য বলার প্রধান কারন এর এর বিষয় লৌকিক জীবনবৃত্ত আশ্রয়ী। এর রূপকার ও শ্রোতা গ্রামীণ লোক জীবনের শরিক। এ গানের রুপায়ন হয় নাগরিক সংস্কৃতির বাইরে অর্থাৎ গ্রামীণ বাতাবরণে। এর রচনাশৈলী ও গঠনে প্রচলিত নাট্যরীতিকে বর্জন করা হয়। Refrain লৌকিক গানের স...

#৬ বোলান কথাঃ ভৌগলিক অবস্থান।

Image
গাজন-চড়ক উৎসব ও নীলপূজার একটি অঙ্গ বোলান। বোলান গ্রামের তথাকথিত অশিক্ষিত মানুষের সমবেত প্রয়াস। এই সকল মানুষদের হয়ত লেখা বা পড়ার ক্ষমতা নেই। কিন্তু জীবনের অভিজ্ঞতায় তারা সকলেই পরিপূর্ণ। তারা তাদের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই বোলান পালার বিষয়বস্তু গ্রহন করেন। ভরা চৈত্রে বসন্তর দিনে হয় বোলান। অন্যসময় হয় না। বোলানের পোষকও গ্রামের মানুষ। বোলান শিল্পীদের গ্রামের মানুষ চাল ডাল টাকা, যার যেমন সাধ্য সেই মত সাহায্য করেন। কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এর ‘গণদেবতা’ উপন্যাস থেকে জানা যায় বীরভূমের ময়ূরাক্ষী নদীতীরবর্তী গ্রামের শতাধিক বর্ষের পুরনো বোলান অনুষ্ঠানের কথা। উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে ধর্মরাজতলায় বোলান পালাগানের কথা। বীরভূম জেলা ধর্মরাজতলা বোলান গান সম্পর্কে সবন্ধু মণ্ডল লিখেছেন, “বোলান মূলত অন্ত্যজ শ্রেণীর অনুষ্ঠান। তৎকালীন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে তারা ছিল অপাংক্তেয়। তাই তারা তাদের কৃষ্টির বহিঃপ্রকাশ হিসাবে এই উৎসবটিকে বেছে নিয়ে ছিল। কারণ শিব উচ্চ শ্রেণীর থেকেও বেশি কাঙ্ক্ষিত নিম্ন শ্রেণীর কাছে"।      বোলান পালার শুরুতে হয় বন্দনা গান। এর পর হয় বো...

#৫ বোলানের ইতিকথা ২।

গাঙ্গেয় উপত্যকায় আজও আদিম অস্ট্রিক জাতির সংস্কৃতি  লক্ষ্য করা যায়। এই সাংস্কৃতিক ধারায় ধর্ম ঠাকুর – প্রাক-বৈদিক, প্রাক-আর্য ও প্রাক-বুদ্ধ। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য বীরভূম জেলার নানা অংশে ধর্ম ঠাকুরের পুজোর সাথে বোলান অঙ্গাঙ্গিক ভাবে জড়িত। আশুতোষ ভট্টাচার্য বলেছেন, “গাজন উৎসব দুর্গোৎসবের মত পণ্ডিতদের হাতে পড়িয়া বিধিবদ্ধ হয় নাই বলিয়া বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ইহার বিভিন্ন রূপ প্রকাশ পাইয়া থাকে”। গাজন সংস্কৃত গর্জন শব্দের বিবর্তিত রূপ। গাজন অর্থে ধর্মরাজের উৎসব বা চড়কপর্বে শিবের উৎসব। চড়ক সংস্কৃত চক্র স্বরাগমে চকর, বর্ণবিপর্যয়ে চড়ক- চৈত্র সংক্রান্তি তিথিতে অনুষ্ঠেয় শিবের ব্রত বা পার্বণ বিশেষ। বোলান লোকনাট্য প্রাচীনত্বে খ্যাত। শ্রী চৈতন্যের সময়ও কি বোলান গান প্রচলিত ছিল? শ্রী চৈতন্যের জীবনীকার বৃন্দাবন দাস রচিত  ‘চৈতন্য ভাগবত’ এ আছে- একদিন আসি এক শিবের গায়ন। ডমরু বাজায় – গায় শিবের কথন।। আইল করিতে ভিক্ষা প্রভুর মন্দিরে। গাইয়া শিবের গীত বেঢি নৃত্য করে।। অর্থাৎ নবদ্বীপে শ্রী চৈতন্যের গৃহে একজন শিব কাহিনীমূলক গানের গায়ক এসে নাচ গান করছিলেন। সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকলে...

#৪ বোলানের ইতিকথা

শ্রদ্ধেয় হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় সংকলিত ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ অনুযায়ী বোলান হল বিশেষ্যপদ(বোলা+অন)। তিনি বোলান শব্দের অনেক অর্থ উল্লেখ করেছেন। বোলান অর্থে কথা বলা, প্রতিবচন বা উত্তর। যেমন- “ঘরে গেল্যা না দিয়া বোলান” (কবিকঙ্কন চণ্ডী)। আবার বোলান অর্থে সম্ভাষণ বোঝায়। যেমন- “আজি কেন না করে বোলান” (মনসামঙ্গল)। আবার, ‘বুলা’ শব্দের অর্থ- ভ্রমণ, পর্যটন করানো বা বিচরণ করা। ‘বোল’ শব্দের অর্থ হল বাক্য, বুলি, কথা, সান্ত্বনা বাক্য, ভাষা, বাদ্যের গৎ, গুঞ্জন, ধ্বনি, চেঁচাইয়া বলা ইত্যাদি। জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস সংকলিত ‘বাঙ্গালা ভাষার অভিধান’ গ্রন্থে ‘বোলান’ এর অর্থ হল বোল, বাক্য, উত্তর, বলানো ইত্যাদি। ‘বুলা’ শব্দের অর্থ ভ্রমণ, সঞ্চারণ। ‘বালা’ শব্দের অর্থে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “শিবের গাজন উৎসবে যারা (প্রধানতঃ নমঃশূদ্রগণ) বেতের ছড়ি লইয়া নৃত্য করে ও গান গায়’। “ সন্ সন্যাসী লইয়া বালা চলেন শিবের বাস, শিব শিব বলিয়া ডাকে ঘন ঘনে”- শিবের গাজন, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ / বঙ্গ সাহিত্য পরিচয়, পৃষ্ঠা ১৫১। এখানে সন্ অর্থে সাধু। সুকুমার সেন রচিত ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস’ অনুযায়ী ছড়া কেটে ঢোল কাঁসির সঙ্গতে গান ...