Posts

Showing posts from November, 2017

#৫ বোলানের ইতিকথা ২।

গাঙ্গেয় উপত্যকায় আজও আদিম অস্ট্রিক জাতির সংস্কৃতি  লক্ষ্য করা যায়। এই সাংস্কৃতিক ধারায় ধর্ম ঠাকুর – প্রাক-বৈদিক, প্রাক-আর্য ও প্রাক-বুদ্ধ। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য বীরভূম জেলার নানা অংশে ধর্ম ঠাকুরের পুজোর সাথে বোলান অঙ্গাঙ্গিক ভাবে জড়িত। আশুতোষ ভট্টাচার্য বলেছেন, “গাজন উৎসব দুর্গোৎসবের মত পণ্ডিতদের হাতে পড়িয়া বিধিবদ্ধ হয় নাই বলিয়া বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ইহার বিভিন্ন রূপ প্রকাশ পাইয়া থাকে”। গাজন সংস্কৃত গর্জন শব্দের বিবর্তিত রূপ। গাজন অর্থে ধর্মরাজের উৎসব বা চড়কপর্বে শিবের উৎসব। চড়ক সংস্কৃত চক্র স্বরাগমে চকর, বর্ণবিপর্যয়ে চড়ক- চৈত্র সংক্রান্তি তিথিতে অনুষ্ঠেয় শিবের ব্রত বা পার্বণ বিশেষ। বোলান লোকনাট্য প্রাচীনত্বে খ্যাত। শ্রী চৈতন্যের সময়ও কি বোলান গান প্রচলিত ছিল? শ্রী চৈতন্যের জীবনীকার বৃন্দাবন দাস রচিত  ‘চৈতন্য ভাগবত’ এ আছে- একদিন আসি এক শিবের গায়ন। ডমরু বাজায় – গায় শিবের কথন।। আইল করিতে ভিক্ষা প্রভুর মন্দিরে। গাইয়া শিবের গীত বেঢি নৃত্য করে।। অর্থাৎ নবদ্বীপে শ্রী চৈতন্যের গৃহে একজন শিব কাহিনীমূলক গানের গায়ক এসে নাচ গান করছিলেন। সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকলে...

#৪ বোলানের ইতিকথা

শ্রদ্ধেয় হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় সংকলিত ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ অনুযায়ী বোলান হল বিশেষ্যপদ(বোলা+অন)। তিনি বোলান শব্দের অনেক অর্থ উল্লেখ করেছেন। বোলান অর্থে কথা বলা, প্রতিবচন বা উত্তর। যেমন- “ঘরে গেল্যা না দিয়া বোলান” (কবিকঙ্কন চণ্ডী)। আবার বোলান অর্থে সম্ভাষণ বোঝায়। যেমন- “আজি কেন না করে বোলান” (মনসামঙ্গল)। আবার, ‘বুলা’ শব্দের অর্থ- ভ্রমণ, পর্যটন করানো বা বিচরণ করা। ‘বোল’ শব্দের অর্থ হল বাক্য, বুলি, কথা, সান্ত্বনা বাক্য, ভাষা, বাদ্যের গৎ, গুঞ্জন, ধ্বনি, চেঁচাইয়া বলা ইত্যাদি। জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস সংকলিত ‘বাঙ্গালা ভাষার অভিধান’ গ্রন্থে ‘বোলান’ এর অর্থ হল বোল, বাক্য, উত্তর, বলানো ইত্যাদি। ‘বুলা’ শব্দের অর্থ ভ্রমণ, সঞ্চারণ। ‘বালা’ শব্দের অর্থে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “শিবের গাজন উৎসবে যারা (প্রধানতঃ নমঃশূদ্রগণ) বেতের ছড়ি লইয়া নৃত্য করে ও গান গায়’। “ সন্ সন্যাসী লইয়া বালা চলেন শিবের বাস, শিব শিব বলিয়া ডাকে ঘন ঘনে”- শিবের গাজন, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ / বঙ্গ সাহিত্য পরিচয়, পৃষ্ঠা ১৫১। এখানে সন্ অর্থে সাধু। সুকুমার সেন রচিত ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস’ অনুযায়ী ছড়া কেটে ঢোল কাঁসির সঙ্গতে গান ...

#৩ ভূমিকা।

“আমরা দুটি ভাই, শিবের গাজন গাই...” শৈশবকালে এই ছড়াটা বলেননি, এমন বাঙালি মেলা ভার (বর্তমানের ‘ sophisticated, convent educated’ শিশুদের কথা আলাদা)। কিন্তু আদতে এটি ছড়া নয়, গাজনের গান, বা আরও সূক্ষ্মভাবে বললে বোলানের গান।  লোকনাট্য বোলান বাংলার চিরায়ত লোকসংস্কৃতির এক উজ্জ্বল অংশ। এটি লোকমানসের এক উল্লেখ্য ফসল যা এখনও সামাজিক জীবনকে পরিপূর্ণতা প্রদান করে। গ্রামীণ জনজীবনকে পূর্ণতা দেওয়ার জন্যই বোলান আয়োজিত করা হয়। একাধিক বাদ্যযন্ত্রের তালে মুখরিত নৃত্যগীতে উদ্বেলিত এই লোকনাট্যে অপরকে আনন্দ দেওয়ার থেকে নিজে আনন্দ পাওয়া মূল কথা। সোজা কথায় বোলান পেশাদার অনুষ্ঠান নয়, মনের স্বতঃউৎসারিত প্রকাশ। ব্যাক্তি চেতনার সাথে সমাজ চেতনার মিশ্রন হল বোলান। লোকজীবন ও লোকবৃত্তের সাথে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ-সম্পর্কযুক্ত লোকনাট্য বোলান। বোলান সজীব। লোক-জীবনের সমাজ যা দেখে, যা বোঝে, যা জানে তাই নিজেদের সমাজের উপযোগী করে তোলে। গ্রামীণ কৃষিনির্ভর সমাজ সম্পর্কে বোলান শিল্পীরা সচেতন ও সতর্ক। এনারা কখনই এর বিরুদ্ধাচার করেন না। লোকশিল্পী স্রষ্টার মুখে সৃষ্টি হয়ে মৌখিক ভাবেই প্রসারিত হয় বোলান। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন...

#২ এক নজরে বোলান।।

Image
প্রাচীনকাল থেকেই বাঙ্গালীর সাধনার শ্রেষ্ঠ সম্পদ হল সঙ্গীত। বাঙ্গালীর ধ্যান-জ্ঞান, সুখ-দুঃখর অনুভুতি সব কিছু ঘিরেই আছে সঙ্গীত। সঙ্গীতকে বাদ দিয়ে বাঙ্গালীর চরিত্র অনুধাবন সম্ভব নয়। আসলে সঙ্গীতই হল বাংলার সংস্কৃতির প্রাণ। বাংলার ভৌগলিক অবস্থান ও ভাষার ভিন্নতার কারণে বিভিন্ন লোক সংস্কৃতি লক্ষ্য করা যায়। বোলান হল এরকমই একটি বাংলার লোকসংস্কৃতি।  মূলত মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, বর্ধমান, বীরভূম জেলার কিছু অংশে চৈত্র মাসের শেষের দিকে অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষ করে শিবের গাঁজনকে কেন্দ্র করে। আগে এর নাম ছিল গাঁজনে বালার গান। পরে সময়ের কালে তা বোলান গান হয়ে যায়। নৃত্য-গীত-অভিনয় যোগে পরিবেশিত হয় বোলান। দলে থাকে গায়ক বাদক। অল্প বয়সী কিশোর নর্তকী ও গায়িকার ভূমিকা পালন করে। এই গানের প্রধান বিষয় সমাজ জীবন ও সমসাময়িক ঘটনা। এতে গুরু-লঘু উভয় বিষয় স্থান পায়। লঘু বিষয়কে বলে রঙপাঁচালি ও গুরু বিষয়কে বলে খণ্ডগীতি। বোলান গান শুরু হয় বন্দনার মাধ্যমে পরে পাঁচালি ঢঙ্গে গান গাওয়া হয়। গানের পর সংলাপের দ্বারা কিছু তত্ত্বকথা বলা হয়। তারপর হয় রঙপাঁচালি যা দর্শকদের আনন্দ দেয়। বোলান গানের শিল্পীরা সাধারণত অপেশাদার হয়।...

#1 লোকসঙ্গীত কী?

লোকসঙ্গীত হল লোকমানস থেকে উদ্ভূত সঙ্গীত, যা সাধারণত শ্রুতি ও স্মৃতিকে নির্ভর করে বহমান থাকে। গীত, বাদ্য ও নৃত্য এই তিনের সমন্বয়ে তৈরি হয় সঙ্গীত। অন্যদিকে লোকগীতি, লোকবাদ্য ও লোকনৃত্য, এই তিনের সমন্বয়ে তৈরি হয় লোকসঙ্গীত। বাংলার লোকসঙ্গীত বৈচিত্র্যময়। পল্লীর জনগনের সংস্কার, বারোমাসে তেরো পার্বণ, জগৎ, প্রকৃতি, নদ-নদী প্রভৃতিকে আশ্রয় করে এ গান বেঁধেছে বাঙালি। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি লোকসঙ্গীত হল ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, বাউল গান, রাখালিয়া, হাপুগান, ব্রতগান ইত্যাদি। বাংলা লোকসঙ্গীতের কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হল – ক) দৈনন্দিন জীবনের সুখ-দুঃখ, ব্যাথা বেদনার বহিঃপ্রকাশ ঘটে এর কথায়। খ) সহজ সরল ছন্দর ব্যবহার। গ) এই গান সম্মিলিত বা একক হয়। ঘ) এই গানের চর্চার জন্য নিয়মিত অনুশীলনের প্রয়োজন হয় না। ঙ) সুরের আবেদন সার্বজনীন। আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার প্রত্যেক গানকে স্বকীয়তা দান করেছে। চ)মানবিক প্রেম-বিরহের ভাবের প্রাবল্য। বিশ্বের যাবতীয় লোকসঙ্গীতের মতো বাংলা লোকসঙ্গীতেও পাঁচ স্বরের (pentatonic scale) ব্যবহার দেখা যায়; যেমন সীমান্ত প্রদেশের  গারো , সাঁওতাল  ও হাজংদের...